বাংলাদেশ আয়কর ক্যালকুলেটর (Income Tax Calculator Bangladesh) — নতুন আয়কর আইন ২০২৩ ও এনবিআর নির্দেশিকা
TulBD বাংলাদেশ আয়কর ক্যালকুলেটর (Income Tax Calculator in Bangladesh) হলো সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী এবং সাধারণ সম্মানিত করদাতাদের জন্য একটি অত্যাধুনিক, এনবিআর অনুমোদিত ও ১০০% নির্ভুল অনলাইন আয়কর হিসাব সমাধান। ২০২৩ সালের নতুন আয়কর আইন (Income Tax Act 2023) এবং সর্বশেষ অর্থ আইনের (Finance Act) বিধানাবলি ও ব্যক্তি শ্রেণির আয়কর স্ল্যাব কঠোরভাবে অনুসরণ করে এই টুলটি তৈরি করা হয়েছে। আমাদের এই ক্যালকুলেটরের মাধ্যমে আপনি খুব সহজেই আপনার মাসিক বা বাৎসরিক বেতন, বাড়ি ভাড়া আয়, ব্যবসা, কৃষি ও অন্যান্য আয়ের বিপরীতে করযোগ্য আয়, স্ল্যাবভিত্তিক মোট কর, অনুমোদিত বিনিয়োগের বিপরীতে ১৫% কর রেয়াত এবং এলাকাভিত্তিক ন্যূনতম কর সমন্বয় করে নিট প্রদেয় কর ও মাসিক সম্ভাব্য টিডিএস (TDS) হিসাব করতে পারবেন।
১. ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা (Tax-Free Thresholds)
বাংলাদেশ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) বিধান অনুসারে বিভিন্ন শ্রেণি ও সামাজিক বাস্তবতার ভিত্তিতে ব্যক্তি করদাতাদের জন্য পৃথক করমুক্ত আয়ের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে:
- সাধারণ পুরুষ করদাতা: বাৎসরিক আয় ৩,৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত সম্পূর্ণ করমুক্ত।
- মহিলা করদাতা এবং ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের প্রবীণ নাগরিক: বাৎসরিক আয় ৪,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত।
- তৃতীয় লিঙ্গ (Third Gender) ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি: বাৎসরিক আয় ৪,৭৫,০০০ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত।
- গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা: বাৎসরিক আয় ৫,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত।
- প্রতিবন্ধী সন্তানের পিতা-মাতা বা আইনগত অভিভাবক: কোনো করদাতার প্রতিবন্ধী সন্তান বা পোষ্য থাকলে প্রতিটি সন্তানের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা অতিরিক্ত ৫০,০০০ টাকা বৃদ্ধি পায় (উভয় পিতা-মাতার মধ্যে যেকোনো একজন এই সুবিধা পাবেন)।
২. ব্যক্তি শ্রেণির প্রযোজ্য আয়কর স্ল্যাব ও করের হার (Tax Slabs & Rates)
করমুক্ত আয়ের সীমা অতিক্রম করার পর অবশিষ্ট করযোগ্য আয়ের ওপর ক্রমানুসারে প্রগতিশীল হারে কর ধার্য করা হয়:
| আয়কর স্ল্যাব (আয়ের স্তর) | করের হার (Tax Rate) | সর্বোচ্চ করের পরিমাণ |
|---|---|---|
| প্রথম ৩,৫০,০০০ / ৪,০০,০০০ / ৪,৭৫,০০০ / ৫,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত | ০% (করমুক্ত) | ০ টাকা |
| পরবর্তী ১,০০,০০০ টাকার ওপর | ৫% | ৫,০০০ টাকা |
| পরবর্তী ৪,০০,০০০ টাকার ওপর | ১০% | ৪০,০০০ টাকা |
| পরবর্তী ৫,০০,০০০ টাকার ওপর | ১৫% | ৭৫,০০০ টাকা |
| পরবর্তী ৫,০০,০০০ টাকার ওপর | ২০% | ১,০০,০০০ টাকা |
| অবশিষ্ট আয়ের ওপর | ২৫% | অবশিষ্ট আয়ের ২৫% |
৩. আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী চাকরিজীবীদের বেতন করমুক্তির নতুন নিয়ম
পুরাতন আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪-তে বাড়ি ভাড়া ভাতা (মূল বেতনের ৫০% বা ৩ লাখ), চিকিৎসা ভাতা (মূল বেতনের ১০% বা ১.২ লাখ) এবং যাতায়াত ভাতার (৩০ হাজার) জন্য আলাদা আলাদা করমুক্ত সীমা নির্ধারণ করা ছিল, যা সাধারণ চাকরিজীবীদের জন্য জটিল ও বিভ্রান্তিকর ছিল।
নতুন আয়কর আইন ২০২৩-এর যুগান্তকারী পরিবর্তন: নতুন আইনে পৃথক ভাতার জটিল হিসাব সম্পূর্ণ বাতিল করে একক সহজ নিয়ম চালু করা হয়েছে। নিয়মটি হলো: চাকরিজীবীর মোট অর্জিত বেতন ও ভাতাদির (Basic, House Rent, Medical, Conveyance, Bonus সহ সর্বমোট প্রাপ্ত অর্থ) এক-তৃতীয়াংশ (১/৩ অংশ) অথবা সর্বোচ্চ ৪,৫০,০০০ (চার লক্ষ পঞ্চাশ হাজার) টাকা—এই দুইটির মধ্যে যেটি কম হবে, তা করমুক্ত আয় হিসেবে গণ্য হবে। অবশিষ্ট টাকা করযোগ্য বেতন হিসেবে কর স্ল্যাবে অন্তর্ভুক্ত হবে। আমাদের ক্যালকুলেটর স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার জন্য এই সর্বোচ্চ ৪.৫ লাখ টাকার ছাড় সমন্বয় করে দেয়।
৪. বিনিয়োগ কর রেয়াত (Investment Tax Rebate) হিসাবের এনবিআর সূত্র
সরকার বৈধ ও উৎপাদনশীল খাতে সঞ্চয় ও বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে ব্যক্তি করদাতাদের কর রেয়াত (Rebate) প্রদান করে। আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী কর রেয়াত হিসাব করার সুনির্দিষ্ট সূত্রটি হলো:
- অনুমোদিত বিনিয়োগের খাতসমূহ:
- ডিপোজিট পেনশন স্কিম (DPS) — বাৎসরিক সর্বোচ্চ ১,২০,০০০ টাকা পর্যন্ত অনুমোদিত।
- জীবন বীমা প্রিমিয়াম (Life Insurance) — পলিসি মূল্যের সর্বোচ্চ ১০% পর্যন্ত।
- বাংলাদেশ সরকারের সঞ্চয়পত্র (National Savings Certificates) ক্রয়।
- ডিএসই / সিএসই অনুমোদিত তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড।
- অনুমোদিত সাধারণ ভবিষ্যৎ তহবিল (GPF) ও প্রদেয় ভবিষ্যৎ তহবিল (RPF)।
- সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক কল্যাণ তহবিল ও গোষ্ঠী বীমা স্কিমে প্রদত্ত চাঁদা।
- রেয়াতযোগ্য অনুমোদিত বিনিয়োগ সীমা (Eligible Cap): নিচের ৩টি পরিমাণের মধ্যে যেটি সর্বনিম্ন হবে, সেটি অনুমোদিত বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য হবে:
- করদাতার প্রকৃত অনুমোদিত বিনিয়োগের যোগফল।
- করদাতার মোট করযোগ্য আয়ের ২০% (২০ শতাংশ)।
- সর্বোচ্চ ১০,০০,০০০ (দশ লক্ষ) টাকা।
- প্রদেয় কর রেয়াতের পরিমাণ: অনুমোদিত বিনিয়োগের ওপর সরাসরি ১৫% (পনেরো শতাংশ) হারে কর রেয়াত পাওয়া যায়। এই রেয়াত স্ল্যাব অনুযায়ী হিসাবকৃত মোট কর থেকে সরাসরি বিয়োগ হয়।
৫. এলাকাভিত্তিক ন্যূনতম কর (Minimum Tax) ও সম্পদ সারচার্জ
যদি কোনো করদাতার করযোগ্য আয় করমুক্ত সীমা অতিক্রম করে, তবে বিনিয়োগ রেয়াতের পরও তাকে তার বসবাসকারী বা ব্যবসায়ের এলাকা অনুসারে ন্যূনতম কর পরিশোধ করতে হবে:
- ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন: ন্যূনতম কর ৫,০০০ টাকা।
- অন্যান্য সিটি কর্পোরেশন এলাকা: ন্যূনতম কর ৪,০০০ টাকা।
- সিটি কর্পোরেশনের বাইরে জেলা, পৌরসভা ও উপজেলা অঞ্চল: ন্যূনতম কর ৩,০০০ টাকা।
এছাড়াও ব্যক্তি করদাতার মোট নিট পরিসম্পদ (Net Wealth) ৪ কোটি টাকার বেশি হলে অথবা একাধিক মোটরগাড়ির মালিকানা কিংবা ৮,০০০ বর্গফুটের গৃহসম্পত্তি থাকলে প্রদেয় করের ওপর ১০% থেকে ৩৫% পর্যন্ত সম্পদ সারচার্জ (Surcharge) প্রযোজ্য হয়।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
প্রশ্ন ১: বাংলাদেশে ন্যূনতম কত টাকা আয় হলে আয়কর প্রদান ও রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক?
উত্তর: সাধারণ পুরুষ করদাতার বাৎসরিক আয় ৩,৫০,০০০ টাকা এবং মহিলা ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সী প্রবীণ করদাতাদের ক্ষেত্রে ৪,০০,০০০ টাকা অতিক্রম করলেই আয়কর প্রযোজ্য হয়। তবে আপনার আয় যদি করমুক্ত সীমার নিচেও থাকে কিন্তু আপনার ট্রেড লাইসেন্স, ক্রেডিট কার্ড, গাড়ি বা টিআইএন (TIN) ব্যবহারের মতো সুনির্দিষ্ট আইনি শর্ত থাকে, তবে বাধ্যতামূলকভাবে জিরো ট্যাক্স রিটার্ন (Zero Return) দাখিল করতে হয়।
প্রশ্ন ২: ডিপিএস ও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করলে সর্বোচ্চ কত টাকা কর রেয়াত পাওয়া যায়?
উত্তর: ব্যাংকিং ডিপিএসের ক্ষেত্রে বাৎসরিক সর্বোচ্চ ১,২০,০০০ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ অনুমোদিত। সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য অনুমোদিত খাতের ক্ষেত্রে করযোগ্য আয়ের ২০% বা ১০ লক্ষ টাকার মধ্যে যেটি কম, তার ওপর ১৫% হারে সরাসরি কর রেয়াত পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, যদি অনুমোদিত বিনিয়োগ ২,০০,০০০ টাকা হয়, তবে ১৫% হারে ৩০,০০০ টাকা কর রেয়াত পাবেন।
প্রশ্ন ৩: বেতন আয়ের ১/৩ অংশ করমুক্তির হিসাবটি কীভাবে কাজ করে?
উত্তর: নতুন আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী মূল বেতন, বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা, বোনাস ইত্যাদি সব মিলিয়ে মোট গ্রস আয় যদি হয় ৯,০০,০০০ টাকা, তবে এর এক-তৃতীয়াংশ হলো ৩,০০,০০০ টাকা (যা সর্বোচ্চ ৪,৫০,০০০ টাকার কম)। ফলে ৩,০০,০০০ টাকা সম্পূর্ণ করমুক্ত থাকবে এবং অবশিষ্ট ৬,০০,০০০ টাকা করযোগ্য আয় হিসেবে স্ল্যাবে হিসাব হবে।
প্রশ্ন ৪: এলাকাভিত্তিক ন্যূনতম কর কখন দিতে হয়?
উত্তর: আপনার মোট করযোগ্য আয় করমুক্ত সীমা অতিক্রম করলে স্ল্যাব অনুযায়ী কর হিসাব হয়। যদি বিনিয়োগ রেয়াত বাদ দেওয়ার পর করের পরিমাণ এলাকাভিত্তিক ন্যূনতম করের (ঢাকা ও চট্টগ্রামে ৫,০০০ টাকা, অন্যান্য সিটিতে ৪,০০০ টাকা, জেলায় ৩,০০০ টাকা) চেয়ে কম হয়, তবে করদাতাকে উক্ত ন্যূনতম কর পরিশোধ করতে হবে।
প্রশ্ন ৫: মাসিক টিডিএস (TDS) কী এবং কেন কাটা হয়?
উত্তর: চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে বছর শেষে এককালীন মোটা অঙ্কের কর পরিশোধের চাপ কমাতে প্রতিষ্ঠানগুলো আনুমানিক বাৎসরিক প্রদেয় করকে ১২ দিয়ে ভাগ করে প্রতি মাসের বেতন থেকে কেটে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়। আমাদের ক্যালকুলেটরের "মাসিক আনুমানিক কর কর্তন" বক্সটি আপনাকে ঠিক এই সঠিক মাসিক কর্তনের পরিমাণ জানিয়ে দেয়।